ট্রেনে পুলিশের উপস্থিতি কি সত্যিই যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে?
ট্রেনে পুলিশের উপস্থিতি কি সত্যিই যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে?
নিজস্ব প্রতিবেদক: ট্রেনের বগিতে পুলিশের উপস্থিতি যাত্রীদের কাছে নিরাপত্তার প্রতীক। বিপদে পাশে দাঁড়ানো, সন্দেহজনক ব্যক্তির ওপর নজরদারি এবং অপরাধ ঘটার আগেই তা প্রতিহত করাই রেলওয়ে পুলিশের মূল দায়িত্ব। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা রেলওয়ে পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ প্রতিরোধ বা সন্দেহজনক ব্যক্তির গতিবিধি পর্যবেক্ষণের চেয়ে টিকিট ও পরিচয় যাচাইয়েই পুলিশের তৎপরতা বেশি দৃশ্যমান। যদিও রেলওয়ে পুলিশ বলছে, টিকিট পরীক্ষা তাদের দায়িত্ব নয়; যাত্রীদের জানমালের নিরাপত্তা ও ট্রেনে অপরাধ নিয়ন্ত্রণই তাদের মূল দায়িত্ব।
কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসে ধর্ষণের অভিযোগ
সম্প্রতি ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামগামী কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসে এক নারী যাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ট্রেনের ক্যান্টিনকর্মী আবু বক্কর সিদ্দিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছেন।
ঘটনাটিকে ঘিরে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে চার পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন।
ঘটনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে—কোনো নারী যাত্রীকে সন্দেহের ভিত্তিতে জিজ্ঞাসাবাদ বা তল্লাশি করতে হলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যথাযথ প্রটোকল কতটা অনুসরণ করা হচ্ছে?
যাত্রীবেশে অপরাধী শনাক্তেও বাড়ছে চ্যালেঞ্জ
ট্রেনে অপরাধের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। গত জুলাইয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনে যাত্রীবেশে ছিনতাইয়ের অভিযোগে ১১ নারীকে গ্রেফতার করে রেলওয়ে পুলিশ।
এ ধরনের ঘটনা দেখিয়ে দেয়, শুধু টিকিট বা পরিচয় যাচাই করলেই ট্রেনের ভেতরের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিয়মিত বগি টহল, সন্দেহজনক আচরণ পর্যবেক্ষণ, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ এবং তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ।
বিশেষ করে নারী, শিশু, একা ভ্রমণকারী এবং অসুস্থ বা অসহায় যাত্রীদের নিরাপত্তায় বাড়তি নজর দেওয়া প্রয়োজন।
জনবল সংকট বড় চ্যালেঞ্জ
রেলওয়ে পুলিশপ্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ব্যারিস্টার মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান জানিয়েছেন, জনবল সংকটের কারণে সব ট্রেনে পর্যাপ্ত পুলিশ দেওয়া সম্ভব হয় না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি পুরো ট্রেনে অনেক সময় মাত্র তিনজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন।
তাই প্রশ্ন থেকেই যায়—একটি দীর্ঘ ট্রেনে মাত্র কয়েকজন পুলিশ সদস্য দিয়ে কীভাবে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব?
নিরাপত্তার সংজ্ঞা কি নতুন করে ভাবার সময় এসেছে?
রেলওয়ে পুলিশের দায়িত্ব শুধু অপরাধ সংঘটনের পর মামলা করা বা আসামি গ্রেফতার করা নয়; অপরাধ প্রতিরোধ এবং যাত্রীকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়াও নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একজন যাত্রীর টিকিট বৈধ কি না, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—ট্রেনে ওঠার পর তিনি নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন কি না।
রেলওয়ে পুলিশের সামনে তাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ শুধু “কে টিকিট ছাড়া উঠেছে” তা শনাক্ত করা নয়; বরং “কার নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে” তা আগেই শনাক্ত করে প্রতিরোধ করা।